সুলতান সামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ

- সাধারণ জ্ঞান - বাংলাদেশ বিষয়াবলী | NCTB BOOK
1.8k

বখতিয়ার খলজীর মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রায় এক শতাব্দীকাল দিল্লি সালতানাত ও বাংলার মধ্যে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে। দিল্লির সুলতানরা বাংলার শাসনকর্তা নিয়োগ করলেও তাঁরা প্রায়ই স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজীর স্বাধীনতা ঘোষণা ও তুঘ্রিলের বিদ্রোহ এই প্রবণতারই প্রকাশ। এসব বিদ্রোহ দমন করতে দিল্লির সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ ও গিয়াসউদ্দিন বলবনকে বাংলা অভিযানে আসতে হয়। বলবন বিদ্রোহ দমন করে তাঁর পুত্র বুঘরা খানকে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। বাংলার এই বিদ্রোহপ্রবণ চরিত্রের জন্য ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারাণী লখনৌতিকে ‘বলঘাপুর’ বা বিদ্রোহের নগরী বলে অভিহিত করেন।

বলবনের মৃত্যুর পর (১২৮৬ খ্রি.) বুঘরা খান নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন। এই ধারাবাহিকতার ফলেই শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের আবির্ভাব ঘটে। ১৩০০ থেকে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল বাংলার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের প্রথম দিকে লখনৌতি শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের অধীনে স্বাধীন ছিল। দিল্লিতে খলজি বংশের শাসনামলে বাংলা কার্যত স্বাধীন থাকলেও তুঘলক বংশ ক্ষমতায় এলে লখনৌতি পুনরায় দিল্লির অধীনে আসে। তবে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা আবার স্বাধীন হয় এবং এই স্বাধীনতা প্রায় দুইশত বছর স্থায়ী হয়।

সুলতান শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১–১৩২২ খ্রি.) ছিলেন গৌড়ের একজন স্বাধীন ও শক্তিশালী শাসক। তিনি আব্বাসীয় খলিফার নামে মুদ্রা জারি করে নিজের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেন। তাঁর শাসনামলে গৌড় মুসলিম শাসকদের রাজধানী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফিরোজ শাহ রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দেন এবং তাঁর শাসনামলে বাংলা পশ্চিমে সোন ও ঘোড়া নদী থেকে পূর্বে সিলেট এবং উত্তরে দিনাজপুর–রংপুর থেকে দক্ষিণে হুগলী ও সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

ফিরোজ শাহের রাজত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট বিজয়। এই বিজয়ের সঙ্গে সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.) ও সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নাম বিশেষভাবে যুক্ত। তাঁর শাসনামলে সোনারগাঁও ও সাতগাঁও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং বিভিন্ন টাকশাল থেকে মুদ্রা জারি করা হয়। তিনি তাঁর পুত্রদের সহায়তায় শাসনকার্য পরিচালনা করেন এবং ক্ষমতা ভাগ করে দেন, যা বাংলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়।

১৩২২ খ্রিস্টাব্দে শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ফিরোজ শাহের শাসনকাল বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের ভিত সুদৃঢ় করে এবং পরবর্তী দীর্ঘ স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে।

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...